রাজস্ব আহরণে দৃশ্যমান সংস্কার না এলে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে আবারো ব্যাংক ঋণ করতে হবে

নতুন সরকারের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনায় যে খাতগুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে বলে জানি, তা মূলত দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্ধারিত হয়েছে।

মামুন রশীদ, প্রথিতযশা ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক। প্রায় ৪০ বছর কাজ করেছেন তিনটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকে, বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোয়। বর্তমানে আর্থিক খাতের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ফাইন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্সের চেয়ারম্যান। বাজেট কাঠামো তৈরি, প্রাধিকার নির্ণয়ন ও বাজেটে ব্যক্তি খাতের স্বার্থ সংরক্ষণ নিয়ে অর্থ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গে বিভিন্ন ভূমিকায় কাজ করছেন প্রায় ৩৫ বছর। আসন্ন বাজেট নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম বাজেটে কোন খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? এবং এ অগ্রাধিকারের পেছনে কী যুক্তি কাজ করেছে?

নতুন সরকারের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনায় যে খাতগুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে বলে জানি, তা মূলত দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্ধারিত হয়েছে। বিশেষভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের সংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

আমি লক্ষ করেছি, বাজেটে ঋণ পরিশোধ ও খাদ্য ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে। এছাড়া ব্যাংক খাতের সংস্কারের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতা বৃদ্ধি ও বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সহায়ক হবে। তবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের পরিমাণ এখনো জিডিপির অনুপাতে কম, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, যা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে দেশের যুবসমাজকে প্রস্তুত করতে সহায়ক হবে।

সার্বিকভাবে নতুন সরকারের বাজেট পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কিছু খাতে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। তবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়ন দক্ষতা নিশ্চিত করা না হলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।

সামগ্রিক বাজেটের সক্ষমতা ও বাস্তবায়নযোগ্যতা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? আপনি কি এটিকে সম্ভাব্য ও বাস্তব মনে করেন?

২০২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট একটি উচ্চাভিলাষী দলিল, যেখানে প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকার মতো ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এ বাজেট কতটা দক্ষভাবে বাস্তবায়নযোগ্য? ইতিহাস বলছে, প্রতি বছরই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হার ৮০ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করে, যেখানে কার্যকারিতা বা ভ্যালু ফর মানি নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকে। বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সক্ষমতার অভাব এখনো অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

বাজেট প্রণয়নের সময় রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা ধরা হয়েছে, যেখানে কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৮ দশমিক ৫ শতাংশের নিচে। রাজস্ব আহরণে দৃশ্যমান সংস্কার না এলে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে আবারো ব্যাংক ঋণ কিংবা উচ্চ সুদের সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকতে হবে, যা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে সংকোচন ঘটাবে।

তবে একটি ইতিবাচক দিক হলো, সরকার করজাল বাড়াতে আয়কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, ভ্যাট ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং কালোটাকা বৈধকরণের সুযোগ সীমিত করায় আগ্রহ দেখিয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা খাতে কিছু বরাদ্দ বৃদ্ধিও লক্ষণীয়। তবু এ বাজেট বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয় না হলে এর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাবে।

কর-জিডিপি অনুপাত এখনো অনেক কম। এ অনুপাত বৃদ্ধির জন্য বাজেটে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?

আগেই বলেছি, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে ৮ দশমিক ৫ শতাংশের নিচে যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। এমন একটি কাঠামো দিয়ে আমরা কখনই টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বা অবকাঠামো বিনিয়োগের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারি না। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বাজেটে কেবল উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই হবে না, দরকার বাস্তবভিত্তিক ও কাঠামোগত সংস্কার।

প্রথমত, করজাল সম্প্রসারণ জরুরি। এর মানে হচ্ছে নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্তি। বর্তমানে প্রায় আট কোটিরও বেশি অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় মানুষ থাকলেও কর ফাইল করেন মাত্র ৩৫-৪০ লাখ, যার অর্ধেকই হয়তো নিয়মিত কর দেন না। বাজেটে ডিজিটাল ট্যাক্স শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআই ও ডাটা অ্যানালিটিকস ব্যবহার করে) প্রবর্তনের কথা উল্লেখ থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না।

দ্বিতীয়ত, কর ব্যবস্থার সরলীকরণ ও কর অফিসে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কর দেয়ার প্রক্রিয়াকে যত বেশি নাগরিকবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর করা যাবে, ততই কর দেয়ার প্রবণতা বাড়বে।

এবং তৃতীয়ত, করের সংস্কারে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানো ও জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই হবে টেকসই সমাধান। নতুবা প্রতি বছরই বাজেটে উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে বাস্তবে হতাশা ঘোচানো যাবে না।

এসএমই খাতকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি বলা হয়। এবারের বাজেটে এ খাতে বিনিয়োগ ও সুযোগ-সুবিধা কতটা বাড়ানো হয়েছে? এটি কি যথেষ্ট বলে আপনি মনে করেন?

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান অনস্বীকার্য—জিডিপির প্রায় ২৮ শতাংশ এবং শিল্প খাতের কর্মসংস্থানের ৮৫ শতাংশ এ খাত থেকেই আসে। এবারের বাজেটে এসএমই খাতের উন্নয়নে কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তবে তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করি।

প্রথমত, শিল্প মন্ত্রণালয় জাতীয় এসএমই নীতি ২০২৫ প্রণয়নের কাজ করছে, যার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে এসএমই খাতের জিডিপিতে অবদান ৩৫ শতাংশে উন্নীত করা। এ নীতিতে ৮৩টি কৌশল ও ৩১০টি কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এ নীতির বাস্তবায়নের জন্য এসএমই ফাউন্ডেশন বাজেট বরাদ্দ চেয়েছে, যা এখনো নিশ্চিত নয়।

দ্বিতীয়ত, ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে এসএমই উদ্যোক্তারা এখনো উচ্চ সুদের হার এবং জটিল প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হচ্ছেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে এসএমই ঋণের গড় সুদের হার ছিল ১২ দশমিক ১৯ শতাংশ, যা অন্যান্য খাতের তুলনায় বেশি। এ উচ্চ সুদের হার এসএমই খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

তৃতীয়ত, এসএমই খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে বাজেটে বিশেষ উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল, যা স্পষ্টভাবে দেখা যায় না।

সার্বিকভাবে বাজেটে এসএমই খাতের জন্য কিছু পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। এসএমই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য আরো সুসংহত ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বর্তমান বাজেটে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে? এগুলো কি বাস্তবসম্মত এবং কার্যকর হবে?

বর্তমান বাজেটে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি ৯-১০ শতাংশের মধ্যে থাকলেও আগামী অর্থবছর শেষে এটি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ লক্ষ্যে বাজেটে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে:

 সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি: বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত সুদের হার ১০ শতাংশে বজায় রেখেছে, যা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

 সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী সম্প্রসারণ: দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

 রাজস্ব নীতিতে পরিবর্তন: করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে, যা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

তবে এ নীতিগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে মুদ্রাস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সার্বিকভাবে বাজেটে গৃহীত নীতিগুলো বাস্তবসম্মত হলেও কার্যকর বাস্তবায়ন এবং বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সাফল্য।

স্থানীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বাজেটে কী কী প্রণোদনা দেয়া হয়েছে? বিদেশী বিনিয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় বিনিয়োগকে কীভাবে উৎসাহিত করা যেতে পারে?

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে স্থানীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশকিছু প্রণোদনা ও নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। বাজেটে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির ২৭ দশমিক ৩৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের ২৩ দশমিক ৫১ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।

স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণোদনার মধ্যে রয়েছে কর কাঠামোর সরলীকরণ, ভ্যাট নেট সম্প্রসারণ এবং তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং ও দক্ষতা উন্নয়নে জোর দেয়া। এছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক।

তবে বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগে জটিলতা এবং উচ্চ সুদের হার স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

বিদেশী বিনিয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হলে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:

 অর্থায়নের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি: এসএমই ও স্টার্টআপগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও ভর্তুকি প্রদান।

 নীতিগত স্থিতিশীলতা: বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।

 পরিকাঠামো উন্নয়ন: অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাই-টেক পার্কগুলোয় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন সুবিধা উন্নত করা।

 প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন: স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করা।

সার্বিকভাবে বাজেটে স্থানীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তবে বাস্তবায়নে আরো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় বাজেটে কী ধরনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে? জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আর কী করা প্রয়োজন?

জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর কেবল একটি অর্থনৈতিক ইস্যু নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। চলতি বাজেটে সরকার জ্বালানি খাতে কিছু অগ্রাধিকার দিয়েছে, বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর কিছু প্রকল্প ঘোষিত হয়েছে। তবে এ উদ্যোগগুলো অনেকাংশেই খণ্ডিত ও নির্দিষ্ট সংকট নিরসনে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বলে মনে হয়। গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উচ্চ ব্যয় এবং অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক মূল্যের ওঠানামা আমাদের জন্য একটি কাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি করেছে।

আমি মনে করি, এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত জ্বালানি নীতি যেখানে আমরা দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের প্রতি আবারো জোর দেব। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির—বিশেষ করে সৌর ও বায়ু শক্তির—প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে আরো বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে। এছাড়া এলএনজি টার্মিনাল ও গ্যাস স্টোরেজ সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য রিজার্ভ তৈরি করতে হবে। বাজেটে এ দিকগুলোর প্রতি সুস্পষ্ট অঙ্গীকার এখনো যথেষ্ট দৃশ্যমান নয়। দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিতে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও বেসরকারি বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলাই এখন জরুরি।

বর্তমান বাজেটে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে আপনি মনে করেন? এবং এর সমাধান কী?

সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বর্তমানে আমি দেখি বিশ্বাসযোগ্যতা ও বাস্তবায়নের ঘাটতিকে কেন্দ্র করে। বাজেট যতই চমৎকার হোক না কেন, যদি তা বাস্তবসম্মত না হয় কিংবা বাস্তবায়নে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা না থাকে, তবে তা অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনার বদলে উল্টো অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। বর্তমানে তিনটি প্রধান ঝুঁকি রয়েছে: এক. রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি না হওয়া; দুই. ডলার বাজারের অস্থিরতা; তিন. মূল্যস্ফীতির চাপ যা মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এ পরিস্থিতির সমাধানে প্রথমেই কর কাঠামোর সংস্কার দরকার। এনবিআরকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত করে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও সুশাসনভিত্তিক কর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, মুদ্রানীতির সঙ্গে আর্থিক নীতির সমন্বয় ঘটিয়ে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। তৃতীয়ত, বাজেট ব্যয়ে অনুৎপাদনশীল খাতগুলোয় কৃচ্ছ্রসাধন করে উৎপাদনমুখী খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সরকারের মধ্যে ‘নীতিগত ধারাবাহিকতা’ ও ‘গভর্ন্যান্স সংস্কৃতি’ গড়ে তুলতে হবে। কারণ বাজেট একটি আর্থিক দলিল হলেও এর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার ওপর। বর্তমানে এ তিনটির সমন্বয়কেই আমি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখি।

আরও